শনিবার, ০২ মার্চ ২০২৪, ১১:৩০ পূর্বাহ্ন
বিজ্ঞপ্তি :
Welcome To Our Website...

খোয়াসাগর দিঘীর পাড়ে ঘুরতে এসে বিপাকে পড়ছে দর্শনার্থীরা

মাহমুদুর রহমান মনজু, লক্ষ্মীপুর
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৭ জুন, ২০২৩
  • ১৫৩ বার পঠিত

লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার দালালবাজারে আছে বিশাল আয়তনের খোয়াসাগর দিঘী। এটি আয়তনে এতই দীর্ঘ যে এর একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে তাকালে কুয়াশাময় মনে হয় বলে এর নামকরণ হয় খোয়াসাগর। দুই শতাধিক বছর পূর্বে আশপাশের এলাকার মাটি ভরাট করে মানুষের ব্যবহারের জন্য পানি সংরক্ষণের প্রয়োজনে দালাল বাজারের জমিদার ব্রজবল্লভ রায় দিঘীটি খনন করেন।

পর্যটন মন্ত্রণালয় ও লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসনের অর্থায়নে দিঘীর উত্তর ও পশ্চিমের একাংশ প্যালাসাইটিং দিয়ে পর্যটকদের বসার ব্যবস্থা করা হয়। এজন্য কয়েকটি পাকা বেঞ্চ নির্মাণ করা হয়। সৌন্দর্য রক্ষার্থে একটি গোলঘর নির্মাণ করা হয় খোয়াসাগর দিঘীর পশ্চিম পাড়ে। এছাড়া বসার জন্য বেশ কয়েকটি পাকা বৃত্তাকার বেঞ্চ রয়েছে। বসার স্থানে সড়কের পাশে ১৩টি সোলার ল্যাম্পপোস্ট লাগানো হয়।

লকডাউনের মধ্যেও ঈদকে কেন্দ্র করে লক্ষ্মীপুরের দালাল বাজার খোয়া সাগর দিঘীর পাড়ে নানা বয়সি মানুষের উপচে পড়া ভীড় শুরু হয়।

জেলার রামগতির কমল নগর, রামগঞ্জ, রায়পুর,চন্দ্রগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর থেকে বেড়াতে আসা শিশু-কিশোর যুবক-যুবতীরা আক্ষেপ করে বলেন, “দূরদূরান্ত থেকে আমরা ঘুরতে আসি ঠিকই কিন্তু ঘুরতে এসে পড়তে হয় বিপদে। চেনা নেই, জানা নেই, দলে দলে বখাটে ছেলেরা এসে আমাদেরকে প্রশ্ন করে, আমাদেরকে বিভ্রান্ত করে।  আমরা কেন আসছি, বাড়ি কোথায়, সাথে নিজের ভাই থাকলেও প্রশ্ন করে- উনি কে? তোমার কি হয়? এরকম উদ্ভট প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় প্রতিনিয়ত।”

সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিকাল বেলা স্বামী-স্ত্রী, ভাই বোন, বন্ধু- বান্ধবী , বোন-ভগ্নিপতি বাসায় আগত মেহমানদের কে নিয়ে যখন এই খোয়া সাগর দিঘীর পাড়ে বেড়াতে আসে তাদেরকে পরতে হয় কোন না কোন ঝামেলায়। হঠাৎ একজন আসেন, এসে নানা প্রশ্ন জড়িয়ে দেন। তারপর আস্তে আস্তে দুজন তিনজন করে জড়ো হতে থাকে ৮ থেকে ১০ জন্য বখাটের একটি টিম।  ভাষাগত ভাবে ঘুরতে আসা যুবক-যুবতীদেরকে অপমান অপদস্থ করতে শুরু করে। একপর্যায়ে তাদের হাতের মোবাইল নগদ টাকা পয়সা ছিনিয়ে নেয়।

অভিযোগ উঠেছে, এই বখাটেরা হচ্ছে হেবা কমেটির সদস্য। আর এই হেবা কমেটির সদস্যরা পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারলে তাৎক্ষণিক বাহিনীর প্রধান ফোন করেন স্থানীয় দালাল বাজার ফাঁড়িতে। মাত্র ১০ – ১৫ মিনিটের মধ্যেই প্রশাসনের লোকজন চলে আসেন খোয়া সাগরদিঘীর পাড়ে ঘটনাস্থলে। এরপর হেবা কমিটির সদস্যরা অনেকেই তাদের দলীয় পরিচয় দেন ।
এক পর্যায়ে প্রশাসন অথবা ফাঁড়ির আইসি যুবক-যুবতীদেরকে হেবা কমেটির সদস্যদের সাথে কথা বলে দালালবাজার ফাঁড়িতে নিয়ে যান। সাথে সাথে হেবা কমিটির সদস্যরা দালাল বাজার ফাঁড়িতে অবস্থান নেন। খোদ ফাঁড়ির আইসির সামনেই বসে শুরু হয় দরকষাকষি। হেবা কমিটি সদস্যদের চাহিদা মতো ৫০,০০০ থেকে সর্বনিম্ন ৩০,০০০ দেয়ার পর পুলিশের হাত থেকে মুক্তি মেলে।
কিন্তু টাকা দিতে অনীহা প্রকাশ করলে এক পর্যায়ে ব্ল্যাকমেইল করা শুরু করে তারা। এমনকি মামলার ভয় দেখায়।
সম্প্রতি আপন বড় ভাই তার ছোট বোনকে লক্ষ্মীপুর উত্তর স্টেশনে নিজের বাইক থেকে নামিয়ে সিএনজি অটোরিকশা যোগে দালাল বাজার তার এক আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়ার জন্য গাড়িতে উঠিয়ে দেন। এরই মধ্যে দালাল বাজার খোয়া সাগরদিঘীর পাড়ে গেলে স্কুল জীবনের বন্ধুর সাথে দেখা হয় ছোট বোনের। দুই সহপাঠী দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ কথা বলা অবস্থায় সেখানে হাজির হয় হেবা কমিটির সদস্যরা। ঘটনাস্থলেই দুই ক্লাসমেটকে নাজেহাল করা শুরু করে এবং মারধর করে। এরপর দালাল বাজার ফাঁড়ির আইসি সালাউদ্দিন শামীমকে ফোন করে হেবা কমেটির সদস্যরা । দুই সহপাঠীকে হেবা কমেটির সদস্যরা মিথ্যা অপবাদ ও সাজানো নাটক সাজিয়ে ফাঁড়ির আইসির হাতে তুলে দেন। তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হয় দালালবাজার ফাঁড়িতে।
একটি বিশ্বস্ত সূত্রে খবর পাওয়ার পর সংবাদকর্মীরা ছুটে যান পুলিশ ফাঁড়িতে। কি ঘটনা ঘটেছিল  জানতে চাইলে ফাঁড়ির আইসি সালাউদ্দিন শামিমের সামনেই বসে হেবা কমেটির সদস্যরা নাজেহাল করেন সংবাদকর্মীদেরকে।

লক্ষ্মীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি মোসলেউদ্দিন ঘটনাটি জানার পর দালালবাজার ফাঁড়ি থেকে ওই দুই সহপাঠীকে থানায়  নিয়ে আসার নির্দেশ দেন আইসি শামিমকে। দালাল বাজার ফাঁড়ি থেকে আইসি শামিম সদর থানায় নিয়ে আসেন তাদেরকে। পরে ওসি মোসলেহ উদ্দিন দুজনের কথা শুনে তাদের কে সম্মানের সাথে ছেড়ে দেন।

স্থানীয়রা জানায়,এতদিন খোয়া সাগর দিঘীর পাড়ে সাধারণ মানুষের বিনোদনের জায়গা হলেও বর্তমানে উচ্ছৃঙ্খল তরুণ, মাদক সেবী, মাদক ব্যবসায়ী, জুয়াড়িদের আড্ডা খানায় পরিণত হয়েছে বিনোদন কেন্দ্রটি।

খোয়া সাগর দিঘীর পাড়ে বসে অনেক যুবক দল বেধে মোবাইলে ইন্টারনেট জুয়া খেলায় লিপ্ত হচ্ছে। এমন উচ্ছৃঙ্খল তরুণদের ভয়ে আতংকে থাকছে সাধারণ দর্শনার্থী ও এলাকার মানুষ। উচ্ছৃঙ্খল তরুণরা মেয়েদের কে কুরুচিপূর্ণ কথা বলতেও দেখা গেছে। প্রতিবাদ করলে তারা দর্শনার্থীদের হেনস্তা করে।

কালিবাজার থেকে ঘুরতে আসা ব্যবসায়ী মুরাদ বলেন, একটু যে আরামে কোথাও ঘুরে বেড়াবেন, তারও কোনো উপায় নেই। যতই দিন যাচ্ছে, ততই যেন বখাটেদের উৎপাত বাড়ছে। ঝামেলা এড়াতে এসব উত্ত্যক্তকারীর বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলতেও চান না।’

রায়পুরের দর্শনার্থী আল আমিন জানান, এধরনের ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে দালাল বাজার খোয়াসাগর পর্যটন কেন্দ্রে। মাঝে মাঝে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মারামারির ঘটনা ঘটছে কিশোরগ্যাং সদস্যদের মাঝে।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বছরখানেক আগেও খোয়াসাগরদীঘির পাড় লোকে লোকারণ্য ছিল। এখন পর্যটক সেরকম একটা আসে না। কারন খোয়াসাগর দিঘীর পাড় এখন দখল করে আছে কিশোর গ্যাং ও হেবা কমেটির সদস্যরা।

তিনি আরো বলেন, লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসক আনোয়ার হোসেন আকন্দ এবং লক্ষ্মীপুর জেলা পুলিশ সুপার মাহফুজ্জামান আশরাফ যদি সুদৃষ্টি দেন তবে খোয়াসাগর দিঘী পর্যটন কেন্দ্র হয়তো ফিরে পেতে পারে তার হারানো ঐতিহ্য।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
Developed By Deshjog TV