শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ০২:১৬ পূর্বাহ্ন
বিজ্ঞপ্তি :
Welcome To Our Website...

মানবিক অপহরণ : অল্প মুক্তিপণে ছাড়া পেত অপহৃত শিশু

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৬ মে, ২০২৩
  • ৯০ বার পঠিত

রাজধানীর উত্তরায় মাদ্রাসারাতুল হিকমা ইসলামিয়া নামক হাফেজিয়া প্রতিষ্ঠানের ছাত্র মুত্তাকী হক। সম্প্রতি মাদ্রাসা থেকে বের হতেই তাকে একজন বলে, ‘তোমার আব্বার নাম বাহার? তোমার বাবা আমার কাছে টাকা পায়। চলো তোমাকে কিছু কেনাকাটা করে দিই।’

কথা বলতে বলতে মায়ের নাম্বার নেয়। মুত্তাকী জানায়, ‘পরিচিত মনে করেই আমি ওই লোককে আম্মুর মোবাইল নাম্বার দিই। এরপর তিনি ফোন করে আমাকে ধরিয়ে দেন, বলেন তোমার আম্মুকে বলো কবির আঙ্কেল কথা বলবে।’ এরপর তিনি কথা বলে ফোন কেটে দেন। তিনি বলেন, তোমার আম্মুর সঙ্গে কথা হয়েছে। তোমাকে বাজার করে দিতে বলছে।

এরপর মুত্তাকী হককে নিয়ে টঙ্গি বাজারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটি হোটেলে খাবার খাইতে বসিয়ে রেখে সটকে পড়ে অপহরণকারী।

মুত্তাকী বলেন, অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করেও ওই লোকের সন্ধান না পেয়ে হোটেলের ম্যানেজারের মোবাইল ফোন থেকে মায়ের নাম্বারে কল করি। এরপর মুত্তাকীর মা হন্তদন্ত হয়ে টঙ্গি এসে শিশু মুত্তাকীকে নিয়ে যান। মাঝখান থেকে কিছু বুঝে উঠার আগেই দুই দফায় অপহরণকারীর দেয়া বিকাশ নাম্বারে দিতে হয় ১০ হাজার টাকা।

সম্প্রতি এমন একটি অভিনব পন্থায় শিশু অপহরণকারী চক্রের সন্ধান পেয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উত্তরা বিভাগ পুলিশ।

রাজধানীর উত্তরা থেকে দুই শিশুকে অপহরণের কথা বলে কৌশলে ভুক্তভোগী পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করে অপহরণকারী চক্র। এমন অভিযোগ পাওয়ার পর শিশু অপহরণকারী চক্রের ৩ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ডিএমপির উত্তরা বিভাগ পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- চক্রের মূল হোতা মো. মিল্টন মাসুদ (৪৫), শাহীনুর রহমান (৩৮) ও সুফিয়া বেগম (৪৮)।

গতকাল শুক্রবার(৫ মে) গাজীপুরের সালনা থেকে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশ বলছে, এই অপহরণকারী চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের সামনে ঘোরাফেরা করে। তাদের টার্গেট আট থেকে ১৬ বছরের শিশু। যারা মোবাইল ফোন ব্যবহার করে না। তবে বাবা কিংবা মায়ের মোবাইল নাম্বার মুখস্থ। স্কুল ফেরা, বাজার ফেরা শিশুদের সঙ্গে পরিচয় হয়, এরপর আগে থেকে কৌশলে জানা পরিচয়ে কথা বলে পরিবারের মোবাইল নাম্বার সংগ্রহ করে। কিছু সময় শিশুদের সঙ্গে গল্প করতে করতেই ওই শিশুর পরিবারের কাছে টাকা দাবি করা হয়। ৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করা হয়। এভাবে গত ৫/৬ বছরে অন্তত আড়াই থেকে তিন শ’ শিশুকে অপহরণ করে কৌশলে মুক্তিপণ আদায়ের পর আবার ছেড়ে দিয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, মারধরের হুমকি বা শিশুর হাত-পা ভেঙে দেয়ার কথা বলে মুক্তিপণ আদায় করা হলেও শিশুদের সঙ্গে খুবই মানবিক আচরণ করা হতো। তাদের মারধর করা হতো না। অনেক সময় ভুক্তভোগী পরিবারের আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় ৫০০ টাকা হলেও অপহৃত শিশুকে ছেড়ে দেয়ার ঘটনা রয়েছে।

চক্রটির অপহরণের শিকার রাজউক উত্তরা মডেল স্কুলের ক্লাস এইটের শিক্ষার্থী মাহির আশরাফ। তার বাবা মহিউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশ বিমানে কর্মরত।

ওই শিশু জানায়, গত ৩ মে স্কুল থেকে ফেরার সময় মিল্টন নামক ওই আঙ্কেলটা বলে তোমার নাম কি জানি, বাবার নাম কি? মা কেমন আছে। নানা সাধারণ কথা বলে। এরপর বাবার নাম্বার নিয়ে আমাকে ধরায় দেয়। বলো- কবির আঙ্কেল কথা বলবে। এরপর তিনি ফোনটা কেটে দেয়। এরপর আমি স্কুল থেকে কোচিং এ চলে যায়। বাসায় ফিরে শুনি আমাকে নাকি অপহরণ করা হয়েছিল। বাবা ভয় পেয়ে ২৫ হাজার টাকা বিকাশ করে দিয়েছে।

অপহরণকারী চক্রের কৌশল সম্পর্কে মুত্তাকীর বাবা বাহার উদ্দিন বলেন, গত ২৪ রমজানে আমি ইতিকাফে বসা ছিলাম। মাদ্রাসা থেকে ফোন আসে, আজকে থেকে ঈদের ছুটি। বাচ্চাকে কি বাসায় পাঠায় দিবো? আমি পাঠাতে পারি। কিন্তু আধা ঘণ্টা পার হলেও মুত্তাকী বাসায় পৌঁছেনি। বাসার দারোয়ান ফোন করে বাসায় জানায় মুত্তাকী এখনো আসেনি। এর কিছুক্ষণ পরই ফোন করে মুত্তাকীকে অপহরণের কথা জানায়। আর টাকা পাঠাতে বলে। এরপরই দিশেহারা হয়ে যায় মুত্তাকীর মা। টাকা পাওয়ার পর টঙ্গি বাজারে একটি হোটেলের ঠিকানা দিয়ে অপহরণকারী বলে- সেখানে আছে মুত্তাকী।

বাহার বলেন, মূলত মুত্তাকীকে হোটেলে বসিয়ে রেখে আমার স্ত্রীর সঙ্গে মুক্তিপণের টাকার দর কষাকষি করেছে। দুই দফায় ১০ হাজার টাকা নিয়ে ছেড়ে দিয়ে সটকে পড়েছে। খবর পেয়ে আমি মসজিদ থেকে বেড়িয়ে থানায় অভিযোগ করি।

এ বিষয়ে উত্তরা বিভাগের উপ-কমিশনার(ডিসি) মোহাম্মদ মোর্শেদ আলম বলেন, গত ২৪ মার্চ উত্তরা ৪ নং সেক্টরের হলি ল্যাবের সামনে থেকে ৬ বছরের শিশু শাহিন শেখ হারিয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও ছেলের সন্ধান না পেয়ে উত্তরা পূর্ব থানায় একটি জিডি করে পরিবার। জিডি তদন্তের সূত্র ধরে প্রথমে অপহরণকারী চক্রের সন্ধান পাওয়া যায়। এরপর বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব সহকারে দেখার নির্দেশনা দেয়া হয়।

পরবর্তীতে উত্তরার বিমানবন্দর জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার(এডিসি) মো. তৌহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে উত্তরা পূর্ব থানার একটি টিম তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় আসামিদের শনাক্ত ও অভিযান পরিচালনা করে গ্রেপ্তার করে।

মোর্শেদ আলম বলেন, এই অপহরণকারী চক্রের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে স্কুল, বাজার, রেস্টুরেন্টসহ নানা জায়গায় একা থাকা ও বাবা-মায়ের সাথে ঘুরতে থাকা শিশুদের টার্গেট করে। কৌশলে আর্থিক অবস্থা, বাবা-মায়ের নাম, পেশা জেনে নেয়। এরপর মোবাইল নাম্বার নিয়ে কথা বলে। পরে সুকৌশলে অপহরণকারীরা হেঁটে কিছু দূর সামনে নিয়ে যায়। এর মাঝে শিশুটির পরিবারের নিকট থেকে মোবাইলে বিকাশ ও নগদের মাধ্যমে টাকা দাবি করে।

তিনি বলেন, সাধারণত অপহরণকারীরা অপহরণের পর নির্যাতন করে টাকা আদায় করে। কিন্তু এই চক্রটি অপহৃতদের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করে। শুধু তাই নয়, ভুক্তভোগী পরিবারের সামর্থ্যের উপরেও মুক্তিপণ দাবি করা হয়। এমনও হয়েছে ৫০০ টাকা নিয়েও অপহৃত শিশুকে ছেড়ে দিয়েছে। আবার কখনো টাকা না নিয়েও অপহৃত শিশুকে একদিন পর ছেড়ে দিয়েছে।

মোর্শেদ বলেন, অপহরণকারীরা কোনো ধরনের নির্যাতনমূলক বা হুমকি-ধামকি না দেয়ার কারণে থানায় অভিযোগ করতেন না। চক্রটি অল্প সময়ের জন্য অপহরণের কৌশল ব্যবহার করতো। খুব কমই কাউকে আটকে রাখতো।

উদাহরণ দিয়ে ডিসি মোর্শেদ বলেন, কিছুদিন আগে উত্তরায় একটি হাসপাতালে বাবা ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলতে বলতে একটি শিশু হারিয়ে যায়। পরিবারের অভিযোগের প্রেক্ষিতে পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে জানতে পারে- চক্রের এক সদস্য ওই শিশু ছেলেটিকে কথা বলতে বলতে সামনে নিয়ে যায়। এরপর একটি বাসে উঠে রাজলক্ষ্মী থেকে চলে যায়। এরপর আমরা তার খোঁজ পায়নি। পরদিন একই হাসপাতালে নামিয়ে দিয়ে যায় অপহরণকারীরা। ওই শিশু জানিয়েছিল, খেয়েছে আর ঘুমিয়েছে। কোনো নির্যাতন করা হয়নি।

চক্রের মূল হোতা মিল্টন মাসুদ (৪৫) সম্পর্কে পুলিশ জানায়, মিল্টন মাসুদের বিরুদ্ধে পাঁচটি অপহরণ মামলা রয়েছে। এর মধ্যে গাজীপুরে তিনটি, ডিএমপি’তে দুটি। তিনি মাদকসেবী। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি একাধিক বিবাহিত। তার পেশাই এই কৌশলে অপহরণ করা।

তার সহযোগী শাহীনুর রহমান (৩৮) নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিলেও তিনিও গত ৬/৭ বছর ধরে এই অপহরণ চক্রে জড়িত। তিনি অপহরণের মুক্তিপণ বিকাশে সংগ্রহে করে দিতেন।

চক্রটি কত বছর ধরে অপহরণে জড়িত ও কতজন শিশুকে অপহরণ করেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিগত ৬/৭ বছর যাবৎ ৫০০ থেকে ৬০০ শিশুকে অপহরণ ও অন্তত তিন’শ পরিবারে কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে চক্রটি।

অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার অনুরোধ জানিয়ে উত্তরার ডিসি মোর্শেদ বলেন, আপনারা বাচ্চাদের অপহরণ সংক্রান্ত সতর্ক করেন। স্কুল ও কোচিং সেন্টারে যাওয়া আসার সময় অপরিচিত কারো সঙ্গে কথা না বলা, মোবাইল নাম্বার না দেওয়া ও কিছু খেতে দিলে না খাওয়ার জন্য সতর্ক করার অনুরোধ জানান।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
Developed By Deshjog TV