বৃহস্পতিবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৫:২১ পূর্বাহ্ন
বিজ্ঞপ্তি :
Welcome To Our Website...

মানুষ ‘বন্ধক’ রেখে ইয়াবার বেচাকেনা, চট্টগ্রামের কিশোরের খোঁজ নেই একমাস

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১ মার্চ, ২০২২
  • ৩৭১ বার পঠিত

কক্সবাজারের পাইকারি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে বাকিতে ইয়াবা কিনে ‘বন্ধক’ রাখা হয়েছিল জলজ্যান্ত এক কিশোরকে। চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার ইয়াবা ব্যবসায়ী আনোয়ার বাকিতে আনা ইয়াবা বিক্রির টাকা শোধ করে ‘বন্ধক’ হিসেবে রাখা কিশোরকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে— এমন শর্তে তারই প্রতিবেশী এক কিশোর মিনহাজকে রেখে এসেছিল কক্সবাজারের এক ইয়াবা ব্যবসায়ীর ঢেরায়। ‌কিন্তু শেষ পর্যন্ত আনোয়ার প্রতিশ্রুতি অনুসারে আর টাকা শোধ করেননি। আর নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পর ১৬ বছর বয়সী ওই কিশোরেরও এখন আর খোঁজ মিলছে না।

মানুষ বন্ধক রেখে ইয়াবা বেচাকেনা চক্রের শিকার চট্টগ্রামের সাতকানিয়া পৌরসভা এলাকার মো. মিনহাজ উদ্দীনের খোঁজ মিলছে না এক মাস পেরিয়ে গেলেও।

জানা গেছে, ছেলেকে বাঁচাতে মুক্তিপণ হিসেবে ৩২ হাজার টাকা অপহরণকারীদের দেন মা খুরশীদা বেগম। কিন্তু তাতেও মুক্তি মেলেনি মিনহাজের। এ বিষয়ে আটদিন আগে পুলিশের দ্বারস্থ হলেও কোনো লাভ হয়নি। পুলিশ এ ঘটনাকে অপহরণ মনে করছে না। তাদের মতে, মিনহাজকে কেউ জিম্মি করে রেখেছে।

শেষ পর্যন্ত নিরুপায় হয়ে চট্টগ্রাম চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কামরুন নাহার রুমির আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন খুরশীদা বেগম। সোমবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) ছেলে অপহরণের ঘটনায় মামলা করেন তিনি।

জানা যায়, সাতকানিয়া পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ড ছিটুয়াপাড়া এলাকার মৃত সামশুল আলমের ছেলে মিনহাজ উদ্দিন (১৬) তিন মাস আগে চট্টগ্রাম নগরীর টেরিবাজার থেকে চাকরি ছেড়ে বাড়ি চলে আসেন। বেকার হয়ে পড়া মিনহাজ চাকরির জন্য একই ওয়ার্ডের পার্শ্ববর্তী রোজমরপাড়ার বদিউল আলম ওরফে বদির ছেলে আনোয়ার হোসেনকে (৩৫) বলেন।

গত ২৮ জানুয়ারি সকাল ৯টার দিকে আনোয়ার চাকরি দেয়ার কথা বলে মিনহাজকে তার ঘর থেকে ডেকে নিয়ে যান। এরপর মিনহাজকে প্রায় সময় তার মা ও বোন ফোন করতেন। মিনহাজ তখন বলতো, আনোয়ারের সঙ্গে সে চাকরি করছে।

গত ১৯ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৩টার দিকে মিনহাজ তার বোন ফরিদা জেসমিনের মোবাইল ফোনে কল দিয়ে বলেন, আনোয়ার তাকে কক্সবাজার এলাকায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির কাছে রেখে চলে গিয়েছেন। এরপর ওই অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি মিনহাজকে আটকে ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করে ফরিদার কাছে।

এরপর ২০ ফেব্রুয়ারি এ বিষয়ে সাতকানিয়া থানায় অভিযোগ দায়ের করেন মিনহাজের মা খুরশীদা বেগম। কিন্তু আটদিন পার হলেও পুলিশ তাকে খুঁজে বের করতে পারেনি। এরমধ্যে ওই অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে এক লাখ টাকা দেয়ার কথা বলেন মিনহাজের পরিবার। সেই অনুযায়ী ৩২ হাজার টাকা পাঠানো হয় অপহরণকারীর দেওয়া বিকাশ নম্বরে (০১৮১৮-২৮১৩৩৬)।

সোমবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে সাতকানিয়া পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ড ছিটুয়াপাড়া ও রোজমরপাড়ায় সরেজমিন গিয়ে এবং এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মূলত আনোয়ার যে পাইকারি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ইয়াবা ক্রয় করেন সেখানে টাকা দিতে না পারায় মিনহাজকে জিম্মি রেখে চলে এসেছেন। মূলত ওই ব্যবসায়ীকে টাকা না দেয়ায় মিনহাজকে এখনো ছেড়ে দেয়নি।

এ ব্যাপারে মিনহাজ উদ্দীনের বড় বোন ফরিদা জেসমিন বলেন, টাকা দিলে আমার ভাইকে ছেড়ে দেবে— এ বিষয়টি জানতে পেরে আমি ও আমার মা আনোয়ারের বাড়িতে যাই। সেখানে গিয়ে মিনহাজ কোথায় জিজ্ঞাসা করলে, আনোয়ারের পরিবারের কেউ কোনো উত্তর দিতে পারেননি। একপর্যায়ে আনোয়ার ও তার স্ত্রী মিনহাজকে এনে দেবেন বলে জানান। পরে খোঁজ নিয়ে দেখি তারা পালিয়েছে।

ফরিদা জেসমিন আরও বলেন, চাকরি থেকে বাড়ি আসার পর আনোয়ারের সঙ্গে চলাফেরা করতো মিনহাজ। আনোয়ারের সঙ্গে চাকরিতে যাওয়ার কথা বলে ঘর থেকে চলে যায় সে। এরপর ভাইকে ফোন করে কোথায় আছে জানতে চাইলে সে বলতো না। কারণ আনোয়ার তাকে ওয়াদা করিয়েছে, কাউকে কিছু না বলতে। পরে আনোয়ারের বাড়ি গিয়ে তাকে পাইনি। সে সময় তার স্ত্রী আমাকে বলেছিলেন, থানা থেকে অভিযোগ তুলে নিলে মিনহাজকে এনে দিবে। আমার ভাইয়ের মোবাইল থেকে খোরশেদ নামের এক ব্যক্তি আমাকে কল করে তিন লাখ ২৫ হাজার টাকা দাবি করেন। পরে অনেক অনুরোধ করে এক লাখ টাকায় রাজি করাই। একটি বিকাশ নম্বরে (০১৮১৮-২৮১৩৩৬) তিন দফায় ৩২ হাজার টাকা দিয়েছি। আজ সন্ধ্যায় আরো এক হাজার টাকা দেয়ার কথা রয়েছে। বাকি টাকা দিতে না পারায় আমার ভাইকে এখনও ছেড়ে দেয়নি। এ ঘটনায় আমার মা বাদি হয়ে আদালতে আনোয়ার ও তার স্ত্রীকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেছেন।

এদিকে বিকাশ নম্বর ও আনোয়ারের ব্যবহৃত ফোন নম্বরে একাধিকবার কল দিলেও নম্বরগুলো বন্ধ পাওয়া যায়।

মামলার আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. শাহেদুল ইসলাম বলেন, সাতকানিয়া পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ড এলাকার মিনহাজ উদ্দিন নামে এক কিশোর অপহরণের দায়ে তার মা খুরশীদা বেগম বাদি হয়ে সোমবার সকালে একটি মামলা দায়ের করেছেন। এ মামলায় রোজমরপাড়ার বদিউল আলম ওরফে বদির ছেলে আনোয়ার হোসেন ও তার স্ত্রী হাবিবা বেগমকে আসামি করা হয়েছে। মামলার তদন্তের জন্য আদালত পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) দায়িত্ব দিয়েছেন।

এ বিষয়ে সাতকানিয়া পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, মিনহাজসহ তিনজন মিলে টেকনাফ যান। সেখানে মিনহাজকে রেখে অন্যরা চলে আসেন। এলাকাবাসীর কাছ থেকে শোনা যায়, ইয়াবার টাকার বদলে জিম্মি হিসেবে মিনহাজকে রেখে আসা হয়।

থানায় দেয়া অভিযোগের তদন্ত কর্মকর্তা সাতকানিয়া থানার উপ-সহকারী পরিদর্শক নাজমুল হাসান বলেন, অভিযোগ তদন্ত করে দেখা যায়, এটি অপহরণ নয়। তবুও তাদের মোবাইল কললিস্ট এনে দিয়েছিলাম। মোবাইল লোকেশনে দেখা যায় টেকনাফ থানা এলাকা। বাদি পক্ষকে ওই থানায় যোগাযোগ করতে বলেছিলাম। পরে তারা কী করেছেন আর জানি না।

নিউজটি শেয়ার করুন

এ জাতীয় আরো খবর..
এই ওয়েবসাইটের লেখা ও ছবি অনুমতি ছাড়া অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
Developed By Deshjog TV